Return Ticket, রিটার্ন টিকিট

Return Ticket, রিটার্ন টিকিট

‘দাদা, আমাদের দেশ ভালো নেই। আমাদের বাঁচান।’
বাংলাদেশ থেকে লিখল বাঁশরি বড়াল। বুকের ভিতরটা কেমন দুমড়েমুচড়ে উঠল। মনে হল, দৌড়ে চলে যাই সীমান্তে। অঝোর বৃষ্টিতে হাতটা বাড়িয়ে বলি, ‘এই তো আছি তোমার পাশে। চলো আমার বাড়ি। ইলিশ রেঁধেছি। গঙ্গার ইলিশ।’ কিন্তু পারি না।
প্রথমে নির্বিচারে ছাত্র-নিধন। পরে আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য। দুটো দেখেই শিউরে উঠেছি। আমার বন্ধুর দেশ ভালো থাকে কী করে? আমিই বা ভালো থাকি কী করে? আমার জন্ম এই দেশে। আমার মা-বাবার জন্ম ও-পারে। ছোটোবেলা থেকেই যে-কোনও প্রসঙ্গে ‘আমাগো দ্যাশে’ এই আছিল, সেই আছিল শুনতে-শুনতে বড়ো হয়েছি। এবং কখন যেন বাংলাদেশ আমারও ‘দ্যাশ’ হয়ে গেছে টের পাইনি। কিন্তু কবে থেকে যে ‘দ্যাশ’ ক্রমে দূরে সরে গেল। একই আকাশ, একই বাতাস। তবু কত দূরে! উঠোন আলাদা, পুঁইমাচা আলাদা, পুকুর আলাদা, চালতা করমচা কামরাঙা— সব আলাদা। রইল শুধু ধর্ম। ধর্ম, ধর্ম, তোমার মন নাই দ্যাশ? যে-দেশকে আমি ভালোবাসি, সেই দেশের মানুষও কি ভালোবাসে আমার দেশকে? না, বাসে না বোধহয়। ব্যথা গাঢ় হয়। রাগও।
ঝুলন আসছে। আমাদের ঘরেও আগে ঝুলন সাজানো হত। ঠাকুরদা যে-ঘরে থাকত, সেই ঘরে। তুলোর পাহাড়। পাহাড়ের খাঁজে সৈন্যসামন্ত। পাহাড়ের নীচে শান্ত নদী। নদীর ধারে লাল মাটির রাস্তা। সেখানে এক উদাস আইসক্রিমওয়ালা। ঠাকুরদা ঝুলন দেখে বলত, “আমগো বাড়ির কাছেই আছিল চিলাই নদী। শাল গাছ আছিল, লাল রাস্তাও আছিল। ঝড় উডলে কতা বুজলানি, শালের জঙ্গলে কত শব্দ... বেবাক মনে পড়ে।” কয়েক হাত ঝুলনের সাজে আস্ত এক বাংলাদেশ উঠে আসত শ্রাবণের সন্ধ্যায়। বৃষ্টিভেজা শালবনের গন্ধ যেন পদ্মার ওপার থেকে ভেসে বেড়াত উঠোনে। ঠাকুরদা ধুতির খুট দিয়ে চোখ মুছত। আর কিছু বলত না। বলার মতো অবস্থাই ছিল না।
সত্তর-দশকে যাদের বাল্যকাল কেটেছে তারা জানে, তখন ‘বঙ্গবন্ধু লাট্টু’ সব ছেলেদের হাতে ঘুরত। বঙ্গবন্ধুর মুখ লাট্টুর উপর খোদাই করা। সেই মুখ আমার হাতের মুঠোয়। আমি লাল লেত্তি দিয়ে একবার বঙ্গবন্ধুকে দূরে ছাড়ছি। আবার কাছে টেনে নিচ্ছি। বঙ্গবন্ধু লোকটা ভালো না মন্দ বোঝার আগেই বড়ো কাছের হয়ে গেলেন। সেই বঙ্গবন্ধুর মাথাটা যখন হাতুড়ি ঠুকে ভাঙা হচ্ছিল, বুকে এসে বাজছিল হাতুড়ির আওয়াজ। বঙ্গবন্ধুর ঘাড়ও কেউ ভেঙে নুইয়ে দিতে পারে! বিশ্বাস হয় না। আমার বন্ধুর দেশ তো সত্যিই ভালো নেই।
কথায়-কথায় ‘স্বাধীন হলাম’ বলাটা অনেকের রোগ। একটা দেশ এতবার স্বাধীন (?) হয় কী করে? কে তাকে বারবার পরাধীন করে? নিজের তৈরি দৈত্যই কি তাকে বারেবারে বিড়ম্বনায় ফেলে? দেশের লোকের ভাবা দরকার। শামসুর রাহমান লিখেছিলেন, ‘স্বাধীনতা তুমি/ রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার।’ কিন্তু যা দেখছি দু’দিন ধরে, কোথায় সেই সাঁতার! এ তো চরম নৈরাজ্য। প্রধানমন্ত্রীর অন্তর্বাস নিয়ে ছবি তোলাই স্বাধীনতা? ঘটি-বাটি, ছাগল, গরু যা পাই, তা বাড়িতে নিয়ে চলে যাওয়াই কি স্বাধীনতা? আরও কত কী ঘটছে? লাজে-ভয়ে ত্রাসে শিউরে উঠছে আমার বন্ধু।
এই লেখা যখন লিখছি তখন বাংলাদেশ থেকেই আমার এক রবীন্দ্রপ্রেমী স্বজন লিখল, ‘দাদা, বাইশে শ্রাবণ কবে? আর পারছি না। কাল রাতে আমার বাসার সামনে কী তাণ্ডব! রাতে ঘুমাই নাই।’
বাসা। মেয়েটি বলল, বাসা। বাসা মানেই তো বাংলাদেশ। বাসা মানে সন্ধের হারমোনিয়ামে ‘মোরা ভোরের বেলায় ফুল তুলেছি দুলেছি দোলায়...।’ বাসা মানে শীতের কাঁথা। এই বাসা ভেঙে যাবে? মুজিবের মাথার মতো নুইয়ে পড়বে আমার বোনের বাসা?
বিশ্বাস হয় না বাংলাদেশ। বিশ্বাস হয় না।
----------------------------------------------------------------------------
লেখকের ভাষা ধার করে বলা যায়, ক্যানিং হাউস হোক, কিংবা আমার টিনের ঘর— রোজ একটু-একটু করে আঁকড়ে ধরে অনিমেষ বৈশ্যর গদ্যেরা, তাঁর গদ্যের মায়াশিকল। সেই শিকল আঁকড়ে ধরে দেওয়ালের বট-অশথের চারাকে। পাখি ডাকে, হাওয়া বয়, আকাশের জল পাতা চুঁইয়ে নীচে পড়ে। টুপটাপ।

Share on:  

Related Products

Three Men in a Boat,  থ্রি মেন ইন এ বোট
₹340.00₹425.00

Three Men in a Boat, থ্রি মেন ইন এ বোট

/>

Try Audiobooks for free!

Cart

Total Amount:

$0.00

empty cart

Your cart is empty!

Looks like you haven't made your menu yet.

© Chat2Order by NCOM Digital Solutions LLPChat2OrderAbout usPrivacyTerms & Conditions
logo
Chat2OrderTypically replies in few mins
Chat2Order

Hello! 👋🏼 What can we do for you? Type below or visit

🛒 chat2order shops 🛒

for more sellers and products!

13:15
logo